নাট্যকর্মী এষা কর-এর জীবন, স্বপ্ন এবং না বলা কিছু কথা

বিজয়া লক্ষী ত্রিপুরা

স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচেনা – বাঁচতে পারেনা। আমরা যে প্রকাশনা পরিবারে আছি, এখানে আমাদের টিমলিডার এক দুর্ধর্ষ স্বপ্নবাজ যাদুকর রাত-দিন আমাদের মাঝে স্বপ্নের দুরারোগ্য ব্যাধির সংক্রমণ ঘটিয়ে যাচ্ছেন অবিরত। সেই ২০১২ সাল থেকে ব্লিটজ-এর সাথে আছি। লিখছি নানা বিষয়ে। এখন আমাদের পরিবার থেকেই বাংলা একটা কাগজ বের হওয়ার পথে। হয়তো সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যেই এটির সূচনাও হবে। ইতোমধ্যেই জমজমাট-এর ওয়েব সংস্করন তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে। জমজমাট কেবল অনলাইন কাগজ নয়। এটির ছাপানো সংস্করণও থাকছে। প্রতি সপ্তাহের ৬৪ পৃষ্ঠার ম্যাগাজিন। তাই টিমলিডারের কড়া আবদার, আমাদেরকেও বাংলায় লেখালেখি শুরু করতে হবে। প্রথম-প্রথম শুনে তো কিছুটা ঘাবরেই গেছিলাম। কারণ, বাংলায় লেখালেখির অভ্যেস বা চর্চা কোনোটাই নেই, তার ওপর বাংলা আমার মাতৃভাষাও নয়। আমি আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য। তবু লিডারের অদম্য উদ্দীপনা আর সীমাহীন মমত্বের কাছে আত্মসমর্পণ না করে উপায় নেই। ওনাকে আমরা বলি অনেকগুলো স্বত্বার সম্মিলনে সৃজিত এক রহস্য পুরুষ। তিনি একাধারা লেখক, সাংবাদিক, সম্পাদক, গীতিকার, সুরকার, কাহিনীকার এবং নির্মাতা। এর কোনোটাতেই তার ক্লান্তি নেই সামান্যও। ক্রমাগত কাজের মাঝে ডুবে থাকতে ভীষণ পছন্দ তার। এতো ব্যস্ততার মাঝেও তার ভেতর রসবোধের কমতি নেই। আমাদের অনেকেই তাঁকে গুরু মানি। শিখছি অনেক কিছুই তার কাছ থেকে, প্রতিনিয়ত।

উনি যখন একবার কোনোকিছু বলে ফেলেন, সেটা লঙ্ঘনের ক্ষমতা সম্ভবত দেবতারও নেই। সৃষ্টিশীল মানুষ, পাগলামি তো থাকবেই। মাঝে-মাঝেই আমরা পত্রিকার কাজ শেষে বসে পড়ি ওনার সঙ্গীতের আড্ডায়। তখন তিনি অন্য আরেক মানুষ। দেখে বোঝাই যাবেনা এই মানুষটাই কতো বড়মাপের সাংবাদিক, যার খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। আর যখন তিনি গান রচনা করেন, তখন হাতে একটা গিটার আর তাঁর সামনে অনূগত কোনো সহকারী। পাশেই ধুপবাতি ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। ওনার সামনে একটা গ্লাসে স্বর্গীয় পানীয়। এটা না হলে নাকি ওনার ভেতরের ‘পরশি’ জেগে ওঠে না। শিষ্যদের সাথে তাঁর কথা হয় চোখের ইশারায়। ওরাও সব ঠিকঠাক বুঝে ফেলে। ঠিক যেনো গুরু-শিষ্যের পরম্পরা। পুরো কামরাজুড়ে সুনসান নীরবতা। কারো মুখে কোনো আওয়াজ নেই। সবার দৃষ্টি তখন ‘গুরু’র দিকে। অবাক করা কান্ড হলো, কখনো-কখনো তিনি এক বসাতেই ৮-১০ গানের কথাও লিখিয়ে ফেলেন। তারপর এক-এক করে সুর দেন প্রতিটা গানের। ওনার অনুগত শিষ্যবাহিনী সেগুলো তাৎক্ষণিক রেকর্ডিং করে নেয়। সে এক ভিন্ন রকমের অনূভূতি যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন।

ক’দিন আগে হঠাৎ করে আমার ডাক পড়লো। হাতে একটা ফাইল ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ফিচার করো। আমি মাথা নেড়ে বললাম, আচ্ছা। এবার তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “নট ইন ইংলিশ। ইটস ইন বাংলা”। দাঁড়ানো থেকে আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। বাংলা? তাও ব্লিটজ-এ! আমাদের বিশ্বজুড়ে কোটি পাঠক আছে জানি। কিন্তু ওদের প্রায় সবাই তো অবাঙ্গালী। সাহস করে বলেই ফেললাম, উই ডোন্ট হ্যাভ বাংলা রিডারশিপ। উনি মুচকি হেসে বললেন, “উই হ্যাভ টু। বাংলা পত্রিকা আসছে জানো তো”? আমি মাথা নেড়ে বললাম, জানি। আর কথা বাড়ানোর সাহস করলাম না। কারণ ওই যে বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না – পরেছো মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।

বসে পড়লাম ফিচার লিখতে।

এষা কর। সবাই তাঁকে এষা নামেই চেনে। কলকাতার থিয়েটারকর্মী – লেখিকা, নাট্যকার এবং নাট্য নির্দেশক। ওনার অভিনেত্রী স্বত্বার বিষয়টা আমাদের প্রশ্নপর্বে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। কেনো গেছেন? বড় মানুষরা ওমনি হয়। ওঁরা নিজেদের সম্পর্কে খুব সামান্যই বলে। তাই বাধ্য হয়েই এখানে-ওখানে তথ্যের সন্ধান করতে লাগলাম।

পাঁচ বছর বা তারও কম বয়েস থেকে এষা তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত ‘কসবা মনিমেলা’র সদস্য হিসেবে যোগ দেয়ার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পা রাখেন। জ্যাঠামশাই চিন্তামনি কর আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ভাস্কর।

ছোটবেলা থেকেই জ্যাঠা মশায়ের স্নেহসান্নিধ্যে এষা’র বড় হয়ে ওঠা – শিল্প, সাহিত্য, ভারতীয় এবং পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিষয়ে নানা অভিজ্ঞতার সঞ্চার, যার প্রভাব পরবর্তীকালে নিজের লেখালেখিতে পড়েছে দারুণভাবে। ছোটদের নিয়ে গড়ে তোলে থিয়েটার গ্রুপ, যেটিতে পরবর্তীকালে যুক্ত হয় ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’ (যাদের আমরা ভুল করে প্রতিবন্ধি বলি)-দের সংযুক্ত করে পূর্ণতা লাভ করে ‘কথা-কলম’।

কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ অবলম্বলে রচনা করেন ‘ডাকঘরে ভ্রমন’ নাটক। এটি নানা জায়গায় মঞ্চস্থ হওয়ার পর এষা লেখিকা ভাস্বতী দাসের ছোটগল্প, ‘সাদা পৃথিবী কালো পৃথিবী’ অনূসরণে রচনা করেন ‘কালো গহ্বর কালো নয়’ নাটকটি, যেটিতে ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’রা অংশ নেয়।

এষা স্বপ্ন দেখেন, ভবিষ্যতে ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’ অনাথদের জন্যে একটা ‘থিয়েটার পল্লী’ প্রতিষ্ঠার, যেখানে ওই সুবিধাবঞ্চিত ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’রা শিখবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা বিষয় – আবৃতি, ছবি আঁকা, নাচ, গান, অভিনয়, সব-সবকিছু। সেটাই হয়ে উঠবে ‘বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন’দের অন্য আরেক ‘শান্তিনিকেতন’।

এষাকে প্রশ্ন করে ছিলাম, থিয়াটারে কেনো এলেন। উত্তরে তিনি বললেন, “অভিনয়ের মাধ্যমে নিজেকে আরো জানতে আর আবিষ্কার করতে চেয়েছিলাম। তাই থিয়েটারে আসা।

“থিয়াটারে নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানকে প্রয়োগ করার সুযোগ থাকে। থিয়াটার একটা পরিপূর্ণ প্রক্রিয়া, যেখানে ক্রমাগত চর্চার মাধ্যমে অভিনয় শেখার সুযোগ পাওয়া যায় এবং নিজেদের ভুলত্রুটিগুলোয় শুধরানোর সময় ও সযোগ থাকে। চর্চার মাধ্যমে ভালো থেকে আরো ভালো কিছু অর্জনের সুযোগ থাকে। একারণেই থিয়াটার থেকেই তৈরী হয় ভালো অভিনেতা বা সূঅভিনেতা”।

থিয়াটার আর সিনেমা-টিভি নাটকের মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোন যায়গায়, এই প্রশ্নের জবাবে এষা বললেন, “থিয়াটারে একটা ধারাবাহিকতার প্রয়োজন হয়, যা একজন অভিনেতার ক্ষেত্রে খুবই জরুরী। কিন্তু সিনেমা বা টিভি নাটকে সেটার প্রয়োজন পড়েনা। থিয়েটারে আমরা দর্শকদের প্রতিক্রিয়াটা তাৎক্ষণিক দেখতে পারি, কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে সেটা দেখা সম্ভব ওটা হলে মুক্তি পাওয়ার পর। থিয়াটারে রিহারসেলের সময় মিউজিক, লাইট ইত্যাদির সংমিশ্রণে ইমোশন তৈরী হয়, যা সিনেমা বা টিভি নাটিকে হয়না – সুযোগও থাকেনা”।

চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তাঁর কোনো প্রায়োরিটি আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে এষা বললেন, “না, অভিনেতা বা অভিনেত্রী হিসেবে আলাদা করে কোনো চরিত্র করবো পছন্দমতো এমনটা ভাবিনা। যে কোনো চরিত্রেই অভিনয় করতে চাই। নিজের মতো ভাবনায় সেটাকে ফুটিয়ে তুলবো”।

থিয়েটারের পাশাপাশি এষা চলচ্চিত্রেও অভিনয় করছেন। টিভি নাটকেও করছেন। তবে, মূল সময়টা তিনি থিয়াটারে দিতেই বেশী ভালোবাসেন।

প্রশ্ন রেখেছিলাম, থিয়েটারে অভিনয়টাকে কি পেশা হিসেবে নেয়া সম্ভব? উত্তরে এষা বললেন, “না, পশ্চিমবঙ্গে এখনো এটা পেশা হয়ে উঠতে পারেনি”।

নিজের ব্যাক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন আর অভিনয়। এই তিনটি ক্ষেত্রের সমন্বয় করেন কীভাবে। এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, “যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রেই তাঁর কর্মক্ষেত্র বা কাজের জায়গা এবং পরিবারের মাঝে ব্যালান্স করে চলতে হয়। তবে একটু আলাদা করে বেশী সময় আমার ছেলেকে দিতেই হয়। কারণ সেটা ওর প্রয়োজন”।

সবশেষে এশাকে বলেছিলাম নিজের অনূভূতিগুলো আমাদের সাথে শেয়ার করতে। তিনি কয়েক মুহূর্ত কিযেনো ভাবলেন, তারপর বললেন, “জীবনের প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত অমূল্য। এই পৃথিবীতে আমরা সবাই কিছুদিনের অতিথি। তাই পৃথিবী এবং এর মানুষজন, পশুপাখি, প্রকৃতির প্রতি আমাদের প্রত্যেকের যথেষ্ঠ দ্বায়বদ্ধতা আছে। তাই ‘আমি’ এই কাজটাকে আলাদা করে গুরুত্ব না দিয়ে সমষ্টিগতভাবে যদি সবাই মিলেমিশে একটু দায়িত্ব নিই পৃথিবী এবং প্রাণকে ভালোবেসে, সযত্নে সুন্দর করে গড়ে তোলার, হিংসাদন্দ – ধর্মীয় বিভেদ, বিচ্ছিন্নতা ভুলে কান্তির ভূখন্ড গড়ে তোলার, তবে বসুধা সত্যিই আবার আগের মতো সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা ‘মা’ হয়ে আমাদের ভালো রাখবে”।

সবশেষে ব্লিটজ পরিবারের প্রতি শুভকামনা জানালেন এষা কর, ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাসিন্দাদের খবরাখবর তুলে ধরার উদ্যোগের জন্যে।

ধন্যবাদ এষা-কে এই সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্যে। আমরা চেয়ে আছি অন্যদের দিকেও। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাকী সবার দিকে। আপনাদের কথাও আমরা তুলে ধরতে চায় ব্লিটজ-এ। আমরা আপনাদেরই পরিবারের কেউ – এই অনূভূতি নিয়ে নিশ্চয়ই আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। আমাদের ফেইসবুক পেইজে সংযুক্ত হয়ে চোখ রাখুন ব্লিটজ-এর সব আয়োজনে। আমাদের ইমেইল ঠিকানাতেও যোগাযোগ করতে পারেন। আপনার বার্তা পেলে, আমরা আনন্দের সাথে আপনার বার্তার উত্তর দেবো। ব্লিটজ হয়ে উঠুক দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সেতুবন্ধন। সবাই ভালো থাকবেন। অবিরাম শুভকামনা রইলো আপনাদের সবার প্রতি। আপনার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের লেখালেখি শেয়ার করতে ভুলবেননা প্লিজ!

বিজয়া লক্ষী ত্রিপুরা গবেষক, সাংবাদিক, কলামিষ্ট এবং ব্লিটজ-এর সিনিয়ার রিপোর্টার

Leave a Comment